
কুলডাঙা গ্রামটা যেন থমকে আছে বহু যুগ। আদিম রুক্ষ লাল মাটির রাস্তা। গ্রামের শেষে ভাঙা কুঠি। পলেস্তারা খসে পড়া দেওয়াল। ইঁটগুলো কঙ্কালের মতো বেরিয়ে। মরচে ধরা জানলার শিক। কুঠির মাটি স্যাঁতসেঁতে, ভেজা। পুরনো পচা কাঠের ভ্যাপসা গন্ধ।
বিকেলে আকাশ কালো করে মেঘ জমছিল। সন্ধ্যে থেকেই ঠান্ডা হাওয়া। বৃষ্টির ঠিক আগে যেমন দেয়।
একটা পরিত্যক্ত কুঠিতেই উঠলাম। চারপাশ চুপচাপ। কুঠির বাইরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। মাঝে মাঝে ভাঙা কবাটগুলো দেওয়ালে আছাড় খাচ্ছে। পায়ের তলায় শুকনো কাঠ। ভাঙছে মড়মড় করে । প্রতিটা শব্দ এই নিস্তব্ধতাকে আরও ধারালো করে তুলছে।
কুঠির ভেতরটা বড় অদ্ভুত। আমরা হলঘরের এক কোণে ব্যাগগুলো রাখলাম। জনসন জানলার ওপাশে তাকিয়ে। বাইরে শব্দ বাড়ছে বাতাসের । মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কেউ ফিসফিস করছে। হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে একটা শব্দ এল। ধাতব কোনো কিছু মেঝেতে পড়ার। জনসন চমকে উঠল। বললাম, "চামচিকা হবে হয়তো।"
জনসন টর্চটা দেওয়ালের দিকে ঘোরাল। একটা পুরনো তেলের ছবি। ফ্রেমটা ভেঙে ঝুলে আছে। ছবিতে এক মেমসাহেবের আবছা মুখ। এই কুঠির ইতিহাসটাও বিচিত্র। সোম মুর্মু বলছিলেন। নীলকুঠি তো কতই হয়। কিন্তু এ কুঠি আলাদা। গ্রামের লোকে বলে এ ‘পুতুল কুঠি’। নীল চাষ বন্ধ হওয়ার পর এক পাগল সাহেব এখানে একা থাকতেন। তিনি নাকি মানুষের সমান বড় বড় কাঠের পুতুল বানাতেন। পুতুলগুলোকে খেতে দিতেন। গল্প করতেন তাদের সাথে। গ্রামবাসীরা কুঠির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেত হাসির শব্দ। সাহেব মারা যাওয়ার পর পুতুলগুলো আর পাওয়া যায়নি। লোকমুখে শোনা যায়, পুতুলগুলো নাকি কুঠির ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে। আজও তারা রাত জাগে, সাহেবের ফেরার অপেক্ষায়।
হঠাৎ জনসন নিজের পকেটে হাত দিল। ফ্যাকাশে হয়ে গেল মুখটা। পকেট থেকে বের করল একটা পুরনো রূপোর কয়েন। "অভ্র, এই কয়েনটা - এটা আমার পকেটে এল কী করে!" আমি কয়েনটা হাতে নিলাম। নকশা কাটা। আবছা, অনেকটা চাদর বাঁধনি পুতুলের অবয়ব।
ঘরের তাপমাত্রা হঠাত আরও কমে গেল। হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বাইরে ধামসার আওয়াজটা এবার একদম কাছে মনে হচ্ছে। যেন কুঠির উঠোনেই কেউ বাজাতে শুরু করেছে।
পরদিন সকালটা একদম অন্যরকম। রোদে লাল মাটি ঝকমক করছে। কাল রাতের সেই ছমছমে ভাবটা আর নেই। আমরা কুঠি থেকে বেরিয়ে গ্রামে গেলাম। সোম মুর্মুর বাড়ি। খুব সাদামাটা মানুষ। বয়স হয়েছে। কিন্তু হাতের কাজ খুব নিখুঁত। উনি বাড়ির উঠোনে বসে কাজ করছিলেন। পাশেই একটা বড় শিরীষ গাছের গুঁড়ি। ওটা কুঁদেই উনি পুতুল বানান। আমরা পাশে বসলাম। খুব স্বাভাবিক আড্ডা। যেন কিছুই হয়নি।
সোমবাবু খুব সহজ করে বোঝালেন। বীরভূমের এই লোকশিল্পের নাম চদর-বদর। চাদর দিয়ে ঘেরা থাকে বলে একে চাদর বাঁধনিও বলে। উনি একটা কাঠের বাক্স দেখালেন। বেশ ভারী। প্রায় বিশ কেজি ওজন। বাক্সের গায়ে খোদাই করা কারুকাজ। ওটাই আসলে মঞ্চ। সোমবাবু নিচে বসলেন। ওপরে কয়েকটা কাঠের পুতুল। উনি সুতো টানলেন। বাজালেন পায়ের ঘুঙুর। পুতুলগুলো হঠাত নেচে উঠল। কী অদ্ভুত সেই ছন্দ! মনে হলো কাঠে প্রাণ ফিরে এসেছে।
মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। জনসনও বেশ স্বাভাবিক। ও নোটবই বের করে স্কেচ করতে লাগল। পুতুলগুলো সাত-আট ইঞ্চির। পরনে রঙিন কাপড়। সাঁওতালি নারী-পুরুষের আদল। সোমবাবু হাসছিলেন। বললেন, "এরা আমার ছেলেমেয়ে।"
আমরা ওনার সাথে মুড়ি আর চা খেলাম। উঠোনে খেলছিল গ্রামের বাচ্চারা। দূর থেকে ধামসা-মাদলের হালকা শব্দ আসছে। সোমবাবুর ছেলে আমাদের ডাব পেড়ে খাওয়াল।
ফেরার সময় সোমবাবু একটা কথা বললেন। খুব শান্ত গলায়। "কুঠিতে থাকছেন থাকুন। কিন্তু রাতের বেলা পুতুলের বাক্সে হাত দেবেন না।" আমি অবাক হলাম। জনসনও থমকে গেল। সোমবাবু তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। আমরা আর প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না। কুঠির দিকে ফেরার পথে রোদ মরে এসেছে। সেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়াটা আবার শুরু হলো। এক ঝাঁক পাখি চিৎকার করে উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। বিকেলের আলোয় খুব নিঃসঙ্গ মনে হলো কুঠিটাকে।
সন্ধ্যা নামার পর হ্যারিকেন জ্বেলে বসেছিলাম আমরা। ঘরে কোনো হাওয়া নেই, কিন্তু হ্যারিকেনের শিখাটা থরথর করে কাঁপছে। বাইরে থেমে গেছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। জনসন ডায়েরি লিখছিল। হঠাত ও কলম থামিয়ে দিল। ওর কান খাড়া। ফিসফিস করে বলল, "শুনতে পাচ্ছিস?"
কুঠির দোতলা থেকে একটা শব্দ আসছে। 'খট... খট... খট'। কেউ যেন খুব ধীর পায়ে কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে হাঁটছে। দোতলার সিঁড়ি অনেককাল আগে ভেঙে পড়েছে। সেখানে কারোর থাকা অসম্ভব। শব্দটা ঠিক আমাদের মাথার ওপরে এসে থেমে গেল। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর হঠাত মনে হলো ওপর থেকে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বড় কোনো কাঠের সিন্দুক ঘষটে নিয়ে যাওয়ার শব্দ।
পুরনো চন্দন কাঠের গন্ধ বাতাসে। জনসন পকেট থেকে রুপোর কয়েনটা বার করে দেখছিল। সেটা হাত ফসকে পড়ল মেঝেতে। ঘুরতে শুরু করল একা একাই। যেন কেউ ওটাকে আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছে। কয়েনটা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে থামল দেওয়ালের সেই মেমসাহেবের ছবির নিচে। টর্চ ফেললাম। দেখলাম, ছবির ফ্রেমের নিচে মেঝেতে কয়েকটা কাঠের কুচো পড়ে। যেন কেউ এইমাত্র কাঠ কুঁদে বের করেছে। আমি ওপরের দিকে তাকালাম। সিলিংয়ের কড়িকাঠ থেকে একটা সরু সুতো। সুতোটা একদম টানটান। নিচ থেকে মনে হচ্ছে, কেউ ওটা ওপর থেকে ধরে আছে। হাত বাড়িয়ে সুতোটা ছুঁতে গেল জনসন। ঠিক সেই মুহূর্তে কুঠির সব দরজা-জানলা একসাথে সজোরে আছাড় খেল। নিভে গেল হ্যারিকেনটা । ঘোর অন্ধকারের মধ্যে মনে হলো, জনসন দীর্ঘ শ্বাস ফেলল আমার কানের কাছে । খুব ঠান্ডা সেই শ্বাসের হাওয়া।
আমি দেশলাই জ্বাললাম। ওর মুখটা নীল হয়ে গেছে। কাঁপতে কাঁপতে ব্যাগ থেকে একটা পুরনো চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি বের করল। ওর প্রপিতামহ এডওয়ার্ড সাহেবের। ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ, সামান্য চাপেই ভেঙে যাবে। মেঝেতে বসে পড়ল জনসন। ফিস ফিস করে বলল, "অভ্র, আমি রিসার্চ করতে আসিনি। এসেছি- এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে"।
ডায়েরির একটা পাতা খুলল জনসন। ১৮৯০ সালের জুন মাস। এডওয়ার্ড সাহেব লিখেছেন সেই আদিবাসী মেয়েদের কথা। যারা এই কুঠিতে কাজ করতে আসত। কিন্তু কোনোদিন ফেরেনি। সাহেব পুতুল বানাতে ভালোবাসতেন। কিন্তু লোকমুখে রটনা ছিল, তিনি কেবল কাঠ ব্যবহার করতেন না। পুতুলের ভেতর গুঁজে দিতেন রক্ত-মাংসের হাড় । তাতে নাকি পুতুল 'জীবন্ত' হয়ে ওঠে। ডায়েরির শেষ পাতায় আঁকা একটা স্কেচ। এই কুঠির নকশা। আর তার নিচে লালচে কালিতে লেখা— "রক্তের ঋণ। শোধ করতে হবে।"
জনসনের হাত কাঁপছিল। ও বলল, "আমার বাবা যখন মারা যান, তখন উনি এই ডায়েরি আর ওই রূপোর কয়েনটা দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমাদের বংশের পাপ এই মাটিতেই রয়ে গেছে। আমি এতদিন বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখানে পা দেওয়ার পর থেকে…" জনসনের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সামান্য একটা শব্দেই আঁতকে উঠছিল। ওর মনে হচ্ছিল, দেওয়ালের ওই মেমসাহেবের ছবিটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ও বিড়বিড় করছিল, "ওরা আমাকে ডাকছে, অভ্র। সাহেব ফিরছে না দেখে ওরা আমাকে নিতে এসেছে।" হঠাৎ নিজের হাতের নখ দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করল মেঝেটা । ঠিক যেমনটা কুঠির দেওয়ালে দেখেছি। গলার আওয়াজটা কেমন যেন ভারী হয়ে গেছে। যেন কোনো বৃদ্ধ মানুষ।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ধামসার আওয়াজটা বাড়তে লাগল। মনে হচ্ছে আওয়াজটা কুঠির নিচ থেকে আসছে। আমরা টর্চ নিয়ে হলের বড় আলমারিটার পেছনে গেলাম। জনসন হঠাত এক জায়গায় থমকে দাঁড়াল। ও মেঝের একটা কাঠের পাটাতনের ওপর টর্চ ফেলল। সেখানে একটা লোহার রিং। সাবধানে টান দিতেই একটা ছোট গোপন দরজা খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার সিঁড়ি। স্যাঁতসেঁতে একটা পচা গন্ধ দলা পাকিয়ে উঠে এল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। নিচে একটা ছোট ঘর। সেখানে সার সার কাঠের পুতুল রাখা। কিন্তু পুতুলগুলো খুব অদ্ভুত। বীরভূমের সাধারণ চদর-বদর পুতুল নয়। এগুলো মানুষের সাইজের। টর্চের আলো পড়তেই দেখলাম, পুতুলগুলোর গায়ে মেমসাহেব আর সাহেবদের পোশাক। তাদের চোখগুলো কাঁচের, কিন্তু একদম জীবন্ত। মনে হচ্ছে আমাদের প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করছে ওরা। ঘরের মাঝখানে একটা বড় কাঠের বাক্স। চাদর দিয়ে নয়, কালচে এক টুকরো চামড়া দিয়ে ঢাকা।
জনসন বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল। ওর হাতে সেই রূপোর কয়েনটা।"বাক্সের ভেতরে কেউ শ্বাস নিচ্ছে, অভ্র।" আমি কান পাতলাম। এক গভীর, গোঙানির মতো শব্দ আসছে বাক্সের ভেতর থেকে। কুঠির দেওয়াল কেঁপে উঠছে ধামসার শব্দে। ডুমুর কাঠের সেই পুতুলগুলো হঠাত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে নিজেদের জায়গা থেকে এক ইঞ্চি সরে এল।
উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছল যখন দেখলাম, গোপন ঘরের সিঁড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেখানে এখন নিরেট দেওয়াল। আমরা মাটির নিচে আটকা পড়েছি। ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে বাতাস । অক্সিজেনের অভাব, নাকি অন্য কিছু—বোঝা যাচ্ছে না। জনসন হঠাৎ পাগলের মতো ওর হাতের ডায়েরিটা ছিঁড়ে ফেলল। কাগজের টুকরোগুলো মিশে গেল ধুলোয় । ওর গায়ের চামড়া কেমন কুঁচকে যাচ্ছে। চোখের মণি দুটো এখন সম্পূর্ণ কালো। যেন দুটো গভীর গর্ত। জনসন টলতে টলতে এগিয়ে গেল বড় বাক্সের দিকে। বাক্সর ভেতরে কেউ ফুঁসছে। যেন নিশ্বাস নিচ্ছে কোনো জানোয়ার। জনসন বাক্সের ঢাকনাটা তোলার জন্য হাত বাড়াল। ওর আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। আমি বারণ করতে যাচ্ছিলাম। চিৎকার করে আটকাতে চেয়েছিলাম ওকে। কিন্তু পারলাম না। জিভ আড়ষ্ট। তালু শুকিয়ে কাঠ। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। শরীরটা যেন পাথরের হয়ে গেছে।
জনসন ঢাকনাটা একটু ফাঁক করল, ভেতর থেকে একটা হাড়হিম করা ঠান্ডা হাওয়া ছিটকে বেরোল। সেই বাতাসে আদিম পচা মাংসের গন্ধ। ঘরের কোণে রাখা বড় পুতুলগুলো হঠাৎ একসাথে মাথা ঘোরাল। কাঠে কাঠে ঘষা লাগার কর্কশ আওয়াজ। আমরা এখন এমন এক রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে ফেরার প্রতিটি পথ একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
জনসন বাক্সের ঢাকনাটা পুরোপুরি খুলে ফেলল। ভেতর থেকে ছিটকে এল জমাট বাঁধা অন্ধকার। ওর হাত দুটো এখন বড় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মোটা হয়ে গেছে আঙুলের গিঁটগুলো । চামড়া ফেটে কাঠের মতো তামাটে রঙ।
বাক্সের ভেতর থেকে ধীর পায়ে কিছু একটা উঠে এল। কোনো মানুষ নয়। লম্বা একটা কাঠের অবয়ব। অবয়বটার মুখে কোনো চোখ নেই। শুধু খোদাই করা এক বীভৎস হাসি।
পুতুলটা হাত রাখল জনসনের কাঁধে। ধনুকের মতো বেঁকে গেল জনসনের শরীরটা । মড়মড় করে হাড় ভাঙার শব্দ।
হঠাত ঘরের দেয়ালগুলো সংকুচিত হতে শুরু করল। ওপরের কড়িকাঠ থেকে সাপের মতো নেমে এল কয়েকশ সরু সুতো । সুতোগুলো জনসনের হাত-পা পেঁচিয়ে ধরল। ও এখন এক জীবন্ত পাপেট। অদৃশ্য কোনো শক্তি ওকে শূন্যে তুলে ঝোলাতে লাগল। জনসন গোঙাতে গোঙাতে আমার দিকে তাকাল। ওর কালো চোখের কোণ দিয়ে জলের বদলে বেরিয়ে আসছে সাদা আঠা ।
আমি এক পা পেছাতে গেলাম। কিন্তু মেঝেটা হঠাত নরম হয়ে গেছে। কাদামাটির মতো। আমার পা দুটো কেউ টেনে ধরল মাটির নিচে। সেই বড় পুতুলটা এবার আমার দিকে মুখ ঘোরাল। ওর খোদাই করা হাসিটা আরও চওড়া হয়েছে। হাতের স্পর্শটা হাড়ের মতো শক্ত আর বরফের মতো ঠান্ডা। টিপে ধরেছে আমার গলা। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। অন্ধকারের ভেতর হাজারটা কাঠি ঠোকার শব্দ। জনসনকে ঘিরে কয়েকশো সুতো নেমে এসেছে ওপর থেকে । ও এখন মাটি থেকে দুই ফুট ওপরে ঝুলছে। ওর হাত-পাগুলো মানুষের নয়, কাঠের পুতুলের মতো। ঝটকা দিয়ে নড়ছে। হঠাৎ সিলিংয়ের কড়িকাঠ ফুঁড়ে নেমে এলেন এক দীর্ঘকায় সাহেব। পরনে ১৮৯০ সালের সেই ধুলোমাখা স্যুট। হাত-পাগুলো সরু সরু লাঠির মতো। মুখটা মোমের মতো সাদা। সাহেব নামতেই ঘরের সবকটা বড় পুতুল কুর্নিশ করার মতো নুয়ে পড়ল। সাহেবের হাতে একটা বড় রুপোর কাঁচি। উনি জনসনের কাছে এগিয়ে গেলেন। জনসন তখন অমানুষিক এক যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। সাহেব জনসনের কপালে সেই রুপোর কাঁচিটা ছোঁয়ালেন। অমনি জনসনের চামড়াটা ফেটে গেল। চামড়ার তলা থেকে বেরিয়ে এল পালিশ করা চকচকে কাঠ। এবার জনসনের হাত-পা পেঁচানো সুতোগুলো নিজের আঙুলে জড়িয়ে নিলেন সাহেব। আঙুল নাড়াতেই জনসন একটা বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে নেচে উঠল। কাঠে কাঠ ঘষার সেই কর্কশ আওয়াজ।
এবার একটা বড় চাদর বের করলেন সাহেব। ঠিক চদর-বদর নাচের চাদর। সেই চাদর দিয়ে পুরো ঘরটা ঢেকে দিতে লাগলেন। আমি বুঝতে পারলাম, আমরা আর মাটির নিচের ঘরে নেই। আমরা এখন সেই চাদর বাঁধনি বাক্সের ভেতরে বন্দি। সাহেব এবার সুতো ছুড়লেন আমার দিকে। হাত-পা অবশ হয়ে আসতে শুরু করল। একটা সরু সুতো পেঁচিয়ে ধরল আমার কবজি। হাতটা এবার শরীর থেকে ছিঁড়ে যাবে।
হঠাৎ মনে পড়লো সোম মুর্মুর দেওয়া শিরীষ কাঠের ছোট পুতুলটার কথা। সোমবাবু বলেছিলেন, ওটা কাছে রাখতে। অন্তত যতদিন এখানে আছি। পুতুলটা দিয়ে সজোরে আঘাত করলাম সাহেবের হাতের সুতোয়। আশ্চর্য! সুতোটা ছিঁড়ে গেল। সাহেব এক বিকট চিৎকার করে উঠলেন। সেই চিৎকারটা মানুষের নয়, যেন শুকনো কাঠ চেরার শব্দ। জনসন তখনও ছটফট করছে। কোনোমতে ফিসফিস করে বলল, "অভ্র, আগুন... আগুন জ্বাল!"
হ্যারিকেনটা আছার মারলাম চাদরের এক কোণে। মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল চাদরটা। আগুনের শিখা চাদর ছাড়িয়ে সাহেবের স্যুটে গিয়ে লাগল। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সাহেব আর ওই বড় পুতুলগুলো । কাঠের শরীরে আগুন লাগলে যেমন শব্দ হয়, ঘর জুড়ে তেমন আওয়াজ। জনসনের শরীর থেকেও ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ও হাসল। ওর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়ালো শেষবারের মতো।
আগুনের হলকায় ফেটে পড়লো দেওয়ালটা । আমিও ছিটকে পড়লাম বাইরে। শুনতে পেলাম জনসনের শেষ চিৎকার। কুঠির গোপন ঘরটা ধসে পড়ছে। মাটির তলা থেকে ধামসার তীব্র আওয়াজ। তারপর সব চুপ।
আমি গ্রামে ফিরে সোম মুর্মুর বাড়ি গেলাম। সোমবাবু উঠোনে নেই। ওনার ছেলে বিষণ্ণ মুখে বসে। জানাল, রাতে সোমবাবু মারা গেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মারা যাওয়ার আগে উনি ওনার সবচেয়ে প্রিয় পুতুলটা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। সেই পুতুলটা নাকি দেখতে অনেকটা জনসনের মতো। আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। ভেতর থেকে যেন পাথর হয়ে গেছি।
কলকাতায় ফিরে এলাম। কিন্তু শান্তি পেলাম না। রাতে একা ঘরে বসলে আজও সেই ‘খট-খট’ শব্দ শুনি। মনে হয় আমার সিলিং থেকে কেউ অদৃশ্য সুতো ঝুলিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাই। কেন জানি মনে হয়, আমার চোখের মণি দুটো দিনে দিনে কালচে আর শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ঠিক কাঠের মতো। জনসন নেই, কিন্তু ওর শেষ হাসিটা মগজে গেঁথে আছে।
মাঝে মাঝে খবরের কাগজে বীরভূমের সেই নীলকুঠির খবর দেখি। পর্যটকরা নাকি ওখানে অদ্ভুত সব ছায়া দেখে। আমি জানি সেগুলো কী। চাদর বাঁধনি পুতুলনাচ হয়তো শিল্প হিসেবে হারিয়ে যাবে। কিন্তু ওই মাটির নিচে তারা আজও নাচে। ইতিহাস ফুরোয় না। সে শুধু নতুন শরীর খোঁজে। কাল রাতে আমার আলমারির ভেতর থেকে একটা কাঠে কাঠ ঘষার আওয়াজ এল। আমি জানি, এবার সুতোর টান আমার শরীরে পড়বে।
